মোবাইল জগতে মটোরোলার নামটি একসময় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা আবারও নতুন নতুন প্রযুক্তি এবং আভিজাত্যপূর্ণ ডিজাইনের মাধ্যমে ভারতীয় বাজারে নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে। Motorola Edge 60 Pro হল সেই ধারাবাহিকতার সর্বশেষ সংযোজন। এই ফোনটি প্রিমিয়াম-গ্রেড স্পেসিফিকেশন, আধুনিক ক্যামেরা সেটআপ, বিশাল ব্যাটারি ও দ্রুত চার্জিং প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক, কেন এই ফোনটি বর্তমানে স্মার্টফোন প্রেমীদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি
প্রথমেই বলতে হবে এর Pantone Dazzling Blue রঙের ভ্যারিয়েন্টের কথা, যা সত্যিই নজরকাড়া। Motorola এই ফোনের জন্য Pantone-এর কালার ভ্যালিডেশন এনেছে, ফলে রঙের নিখুঁততা ও প্রিমিয়াম লুক বজায় থাকে। ফোনটির বডি ধাতব ফ্রেম ও গ্লাস প্যানেল দিয়ে তৈরি, যা একে দৃঢ়তা ও আভিজাত্য দুটোই দিয়েছে।
ফোনটির IP68 ও IP69 রেটিং রয়েছে, অর্থাৎ এটি ধুলো ও পানির প্রতিরোধী। এমনকি হালকা জলপ্রবাহ বা বৃষ্টির মধ্যেও এটি নিরাপদে ব্যবহার করা সম্ভব। এছাড়া MIL-STD-810H মান অনুসারে টেকসই টেস্ট পাস করেছে, তাই দৈনন্দিন ব্যবহারে ছোটখাটো আঘাত বা স্ক্র্যাচ নিয়ে দুশ্চিন্তার সুযোগ কম।
ডিসপ্লে : উজ্জ্বল ও রঙিন অভিজ্ঞতা
Motorola Edge 60 Pro-তে আছে ৬.৭ ইঞ্চির pOLED ডিসপ্লে, যার রেজোলিউশন ফুল এইচডি+। ১২০ হার্জ রিফ্রেশ রেট এবং HDR10+ সাপোর্টের কারণে ভিডিও স্ট্রিমিং, গেমিং কিংবা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করা—সবকিছুই অত্যন্ত স্মুথ ও রঙিন লাগে। সর্বোচ্চ ৪,৫০০ নিটস পিক ব্রাইটনেসের ফলে রোদেল দিনে আউটডোর ভিউয়িংও বেশ আরামদায়ক।
Pantone ভ্যালিডেশনের কারণে রঙের সঠিকতা উল্লেখযোগ্য। যেসব ব্যবহারকারী কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা ফটো এডিটিং করেন, তাদের জন্য এই বৈশিষ্ট্যটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
পারফরম্যান্স ও হার্ডওয়্যার শক্তি
ফোনটিতে ব্যবহৃত হয়েছে MediaTek Dimensity 8350 Extreme চিপসেট, যা ৪ ন্যানোমিটার প্রযুক্তিতে তৈরি। এটি বর্তমানে মিড-হাই রেঞ্জের অন্যতম শক্তিশালী প্রসেসর। ভারী গেম, ভিডিও এডিটিং বা মাল্টিটাস্কিং—সবক্ষেত্রেই এটি দারুণ পারফর্ম করতে সক্ষম।
স্টোরেজের ক্ষেত্রে Edge 60 Pro আসছে একাধিক ভ্যারিয়েন্টে। সবচেয়ে জনপ্রিয় হল ৮ জিবি র্যাম + ২৫৬ জিবি স্টোরেজ, এছাড়াও ১২ জিবি র্যাম ভ্যারিয়েন্ট ও ১৬ জিবি র্যাম + ৫১২ জিবি স্টোরেজ ভ্যারিয়েন্টও রয়েছে। স্টোরেজ টাইপ UFS 4.0 হওয়ায় ডাটা রিড/রাইট স্পিড খুব দ্রুত, যা অ্যাপ লোড টাইম ও গেম পারফরম্যান্সে উন্নতি আনে।
সফটওয়্যার অভিজ্ঞতা
Motorola Edge 60 Pro চলছে অ্যান্ড্রয়েড ১৫-এ, প্রায় স্টক অ্যান্ড্রয়েড অভিজ্ঞতার কাছাকাছি। অপ্রয়োজনীয় ব্লোটওয়্যার নেই বললেই চলে। Motorola তাদের MyUX ইন্টারফেস ব্যবহার করেছে, যেখানে জেসচার কন্ট্রোল, কুইক মোশন এবং পার্সোনালাইজড থিমিংয়ের মত সুবিধা রয়েছে।
সিকিউরিটি আপডেট ও ওএস আপগ্রেডের জন্য কোম্পানি একাধিক বছরের সাপোর্টের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদী ব্যবহারে একে আরও নির্ভরযোগ্য করে তোলে।
ক্যামেরা সিস্টেম : ফটোগ্রাফারদের জন্য স্বপ্ন
পিছনের ক্যামেরা সেটআপটি সত্যিই প্রশংসনীয়। এখানে রয়েছে:
- ৫০ মেগাপিক্সেল প্রধান সেন্সর OIS (Optical Image Stabilization)-সহ।
- ৫০ মেগাপিক্সেল আলট্রাওয়াইড সেন্সর, যা ম্যাক্রো শট নিতেও সক্ষম।
- ১০ মেগাপিক্সেল টেলিফটো লেন্স, ৩x অপটিক্যাল জুম সুবিধাসহ।
ফলাফল হিসেবে ডে-লাইট ও লো-লাইট উভয় পরিবেশেই স্পষ্ট, ডিটেইলড ছবি পাওয়া যায়। ভিডিও রেকর্ডিংয়ে ৪কে পর্যন্ত সমর্থন রয়েছে এবং স্টেবিলাইজেশন যথেষ্ট কার্যকর।
সামনের দিকে রয়েছে ৫০ মেগাপিক্সেল সেলফি ক্যামেরা। গ্রুপ সেলফি, ভিডিও কল বা কনটেন্ট ক্রিয়েশনের জন্য এই লেন্স যথেষ্ট। HDR সাপোর্টের কারণে পোর্ট্রেট শটে স্কিন টোন আরও প্রাকৃতিক ও রঙের ভারসাম্য ভালো থাকে।
Read More :- Motorola G05: বাজেট সেগমেন্টে নতুন চমক
ব্যাটারি ও চার্জিং পারফরম্যান্স
এজ ৬০ প্রো’তে ব্যবহৃত হয়েছে ৬,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি। এর ফলে ভারী ব্যবহারেও একদিনের বেশি ব্যাকআপ পাওয়া সম্ভব। ফাস্ট চার্জিংয়ের জন্য রয়েছে ৯০ ওয়াট তারযুক্ত চার্জার, যা প্রায় আধ ঘণ্টার মধ্যে ফোনকে ৫০-৬০% পর্যন্ত চার্জ করতে পারে।
তাছাড়া, ১৫ ওয়াট ওয়্যারলেস চার্জিং এবং ৫ ওয়াট রিভার্স চার্জিং সুবিধাও আছে। রিভার্স চার্জিংয়ের মাধ্যমে ইয়ারবাডস বা স্মার্টওয়াচের মত ছোট ডিভাইস চার্জ করা যাবে।
কানেক্টিভিটি ও অতিরিক্ত ফিচার
- ৫জি নেটওয়ার্ক সাপোর্ট — ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল ৫জি নেটওয়ার্কে সহজেই কাজ করবে।
- Wi-Fi 6E ও Bluetooth 5.3 রয়েছে, যা দ্রুত ও স্থিতিশীল সংযোগ নিশ্চিত করে।
- স্টেরিও স্পিকার Dolby Atmos সাপোর্টেড, ফলে সিনেমা বা গেমিংয়ে সাউন্ড কোয়ালিটি চমৎকার।
- ইন-ডিসপ্লে ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানার ও ফেস আনলক সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
ভারতে দাম ও Flipkart অফার
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে Flipkart-এ Motorola Edge 60 Pro-এর বেস মডেল (৮GB + ২৫৬GB) বিক্রি হচ্ছে আনুমানিক ₹২৬,৯৯৯ টাকায়। ১২GB + ২৫৬GB ভ্যারিয়েন্টের দাম প্রায় ₹৩০,৯৯৯, আর সর্বোচ্চ ১৬GB + ৫১২GB ভ্যারিয়েন্টের দাম প্রায় ₹৩৪,৯৯৯।
Flipkart বর্তমানে বিভিন্ন অফার চালু রেখেছে, যেমন:
- নির্বাচিত ব্যাংক কার্ড ব্যবহার করলে ১০% পর্যন্ত ইনস্ট্যান্ট ডিসকাউন্ট।
- এক্সচেঞ্জ অফারের মাধ্যমে পুরনো ফোন বদলে সর্বোচ্চ ₹৫,০০০ পর্যন্ত ছাড়।
- EMI অপশন ও Flipkart Pay Later সুবিধা।
(দাম ও অফার সময়ের সাথে পরিবর্তিত হতে পারে।)
প্রতিদ্বন্দ্বী ফোনের সাথে তুলনা
একই দামের রেঞ্জে Samsung Galaxy S24 FE বা OnePlus 13R-এর মত ফোন রয়েছে। তবে Motorola Edge 60 Pro ব্যাটারি ব্যাকআপ ও রঙের সঠিকতার ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা দেয়। এর ওয়্যারলেস চার্জিং ও IP69 রেটিং অনেক প্রতিযোগী মডেলে নেই।
যদিও Samsung বা OnePlus সফটওয়্যার আপডেটের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি সাপোর্ট দিতে পারে, Motorola-ও এখন নিয়মিত আপডেটের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, যা অতীতে তাদের দুর্বলতা ছিল।
কেন এই ফোনটি বিবেচনা করবেন
- উচ্চ মানের ডিসপ্লে – Pantone ভ্যালিডেশন, ১২০ হার্জ রিফ্রেশ রেট এবং HDR10+।
- শক্তিশালী ব্যাটারি ও চার্জিং প্রযুক্তি – ৬,০০০ এমএএইচ ব্যাটারি, ৯০ ওয়াট চার্জার।
- টেকসই বিল্ড ও প্রিমিয়াম ডিজাইন – IP69 ও MIL-STD সার্টিফিকেশন।
- প্রিমিয়াম ক্যামেরা সেটআপ – ৫০ MP সেলফি ও ট্রিপল রিয়ার ক্যামেরা।
- Flipkart অফার ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য – প্রিমিয়াম ফিচার সত্ত্বেও দাম তুলনামূলক কম।
চূড়ান্ত মতামত
Motorola Edge 60 Pro হল এমন একটি স্মার্টফোন, যা প্রিমিয়াম সেগমেন্টে মান ও দামের মধ্যে অসাধারণ ভারসাম্য বজায় রেখেছে। বড় ব্যাটারি, দুর্দান্ত ডিসপ্লে, দ্রুত চার্জিং ও শক্তিশালী ক্যামেরা—সব মিলিয়ে এটি ২৫-৩৫ হাজার টাকার মধ্যে অন্যতম সেরা প্যাকেজ।
যারা গেমিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন বা মাল্টিটাস্কিং করেন এবং একইসঙ্গে ব্যাটারি ও বিল্ড কোয়ালিটি নিয়ে আপস করতে চান না, তাদের জন্য এটি একটি দুর্দান্ত পছন্দ হতে পারে। যদি আপনি প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতা চান কিন্তু বাজেট ফ্ল্যাগশিপের বেশি খরচ করতে না চান, তাহলে Motorola Edge 60 Pro নিঃসন্দেহে আপনার তালিকায় থাকা উচিত।
এইভাবেই Motorola আবারও প্রমাণ করল যে তারা এখনও বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো স্মার্টফোন আনতে পারে। ভারতের ক্রেতাদের জন্য Edge 60 Pro এক নতুন অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে — আভিজাত্য, পারফরম্যান্স ও দামের মধ্যে চমৎকার সমন্বয়।
Read More :- Motorola G45 5G: মাঝারি বাজেটে প্রিমিয়াম অনুভূতির স্মার্টফোন

