বর্তমান সময়ে স্মার্ট টিভির বাজার যত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে, তত দ্রুত নতুন ব্র্যান্ড ও মডেল হাজির হচ্ছে। তবে বাজেট সেগমেন্টে এমন কিছু টিভি আছে যেগুলি দামে সাশ্রয়ী অথচ ফিচারের ক্ষেত্রে আপোষ করে না। Daiwa-এর D32H1COC 32-ইঞ্চি HD-Ready LED Smart Linux TV তেমনই একটি পণ্য। এই রিভিউতে আমরা এর ডিজাইন, ডিসপ্লে, অডিও পারফরম্যান্স, সফটওয়্যার, কানেক্টিভিটি, এবং ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা সব দিক বিশদে আলোচনা করব।
ডিজাইন ও বিল্ড কোয়ালিটি: মিনিমালিস্ট ও ব্যবহারবান্ধব
প্রথম দর্শনেই টিভিটির বেজেল-লেস এজ-টু-এজ ডিজাইন চোখে পড়ে। সরু বর্ডার স্ক্রিনকে বড় মনে করায় এবং ভিউয়িং অভিজ্ঞতাকে আরও ইমারসিভ করে তোলে। কালো ফিনিশ এবং মজবুত প্লাস্টিক বডি এটিকে যথেষ্ট প্রিমিয়াম লুক দিয়েছে, যা ছোট বা মাঝারি আকারের লিভিং রুম বা বেডরুম উভয় জায়গায় মানিয়ে যায়। এর ওজন প্রায় ৪ কেজি হওয়ায় একা হাতে ইনস্টল করাও সহজ।
ওয়াল মাউন্ট ও টেবিল স্ট্যান্ড—দুইভাবেই বসানো যাবে। ছোট জায়গায় বসবাসকারী পরিবার বা ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য এটি সুবিধাজনক, কারণ জায়গার সাশ্রয় করে দেয়।

ডিসপ্লে ও ভিজ্যুয়াল পারফরম্যান্স: HD Ready কিন্তু কার্যকর
Daiwa-এর এই মডেলটি 1366×768 পিক্সেল রেজল্যুশনের HD Ready স্ক্রিন ব্যবহার করে। যদিও বর্তমান সময়ে Full HD ও 4K টিভি জনপ্রিয়, ছোট ঘর বা মাঝারি দূরত্ব থেকে দেখার জন্য এই রেজল্যুশন যথেষ্ট। রঙের উজ্জ্বলতা ও কনট্রাস্ট ভালো, ফলে মুভি বা সিরিজ দেখার সময় ছবির মান তেমন খারাপ মনে হবে না।
৬০ Hz রিফ্রেশ রেট সাধারণ টিভি ব্যবহারকারীদের জন্য যথেষ্ট স্মুথ। লাইভ স্পোর্টস বা অ্যাকশন মুভিতে বড় ধরনের ঝাপসা দেখা যায় না। ভিউয়িং অ্যাঙ্গেল প্রায় ১৭৮ ডিগ্রি হওয়ায় ঘরের বিভিন্ন কোণ থেকে দেখলেও রঙ বা কনট্রাস্টের বড় পরিবর্তন দেখা যায় না।
Eye-Care মোড: চোখের আরামের জন্য বাড়তি সুবিধা
অনেক বাজেট টিভিতেই চোখের সুরক্ষার জন্য আলাদা কোনো মোড থাকে না, কিন্তু Daiwa এখানে “Eye-Care Mode” যুক্ত করেছে। রাতে অল্প আলোতে দেখার সময় এই মোড ব্লু-লাইট কমিয়ে চোখের ক্লান্তি ও শুষ্কতা হ্রাস করে। বিশেষত যাদের বাচ্চারা বেশি টিভি দেখে বা অন্ধকার ঘরে সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন, তাদের জন্য এটি উল্লেখযোগ্য সুবিধা।

অডিও পারফরম্যান্স: ২০ ওয়াট স্পিকার, সাধারণ ব্যবহার উপযোগী
টিভিটিতে দুটি স্পিকার রয়েছে, যেগুলি মিলিয়ে ২০ ওয়াট RMS আউটপুট দেয়। সাধারণভাবে সিনেমা, সিরিজ, বা গান শোনার জন্য এই সাউন্ড কোয়ালিটি যথেষ্ট। মিড ও হাই ফ্রিকোয়েন্সি পরিষ্কার শোনা যায়, যদিও বেস কিছুটা সীমিত। যদি আপনি সিনেমা হলে-মতো সাউন্ড চান বা নিয়মিত হাই-বিট মিউজিক শুনেন, তবে একটি আলাদা সাউন্ডবার বা হোম থিয়েটার সিস্টেম জুড়লে অভিজ্ঞতা আরও উন্নত হবে।
সফটওয়্যার ও ইন্টারফেস: Linux-ভিত্তিক স্মার্ট প্ল্যাটফর্ম
এই মডেলটি Linux OS-এ চলে, যা Android TV বা Google TV-এর মতো বিস্তৃত অ্যাপ স্টোর সরবরাহ না করলেও বেসিক স্ট্রিমিং ও নেটওয়ার্কিং-এর জন্য যথেষ্ট। প্রি-ইনস্টলড YouTube, Amazon Prime Video, Zee5 ইত্যাদি জনপ্রিয় OTT অ্যাপ দেওয়া আছে। হোম স্ক্রিন ইন্টারফেসটি সরল ও ল্যাগ-ফ্রি, তাই নতুন ব্যবহারকারীরাও সহজে ব্যবহার করতে পারবেন।
টিভিটির Quad-Core Amlogic 921 প্রসেসর এবং Mali-G31 GPU বেসিক ভিডিও স্ট্রিমিং ও নেট ব্রাউজিং-এ ভালো কাজ করে। ৫১২ MB RAM এবং ৪ GB স্টোরেজ সীমিত মনে হতে পারে, কিন্তু এই দামে স্মার্ট টিভির জন্য এটি প্রত্যাশিত। ভারী গেম বা অতি-জটিল অ্যাপ চালানোর জন্য এটি নয়।
কানেক্টিভিটি: পর্যাপ্ত পোর্ট ও ওয়্যারলেস সাপোর্ট
Daiwa এই টিভিতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের কানেক্টিভিটি দিয়েছে। রয়েছে দুটি HDMI পোর্ট, দুটি USB পোর্ট, ইথারনেট পোর্ট এবং বিল্ট-ইন WiFi (২.৪ GHz)। এছাড়াও Miracast ও Apple AirPlay সমর্থন রয়েছে, যার ফলে স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ থেকে সহজেই স্ক্রিন শেয়ার করা যায়।
এই সমস্ত ফিচার পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে ছবি/ভিডিও শেয়ার করা, বড় পর্দায় প্রেজেন্টেশন দেখানো বা মোবাইল গেম স্ক্রিনে মিরর করার মতো কাজে সহায়ক।
পারফরম্যান্স ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা
সাধারণ দৈনন্দিন ব্যবহারে এই টিভি দ্রুত রেসপন্স দেয় এবং ইউটিউব বা প্রাইম ভিডিও স্ট্রিমিং-এ বাফারিং সমস্যা হয় না, যদি আপনার ইন্টারনেট সংযোগ ভালো হয়। মেনু পরিবর্তন ও সেটিংস নেভিগেশন বেশ স্মুথ, যদিও মাঝে মাঝে ভারী কন্টেন্ট চালালে সামান্য বিলম্ব হতে পারে।
টিভিটির হালকা ওজন এবং শক্তি-সাশ্রয়ী ডিজাইন ছোট অ্যাপার্টমেন্ট ও হোস্টেলের জন্য আদর্শ। Standby মোডে বিদ্যুৎ খরচ খুব কম, তাই দীর্ঘ সময় প্লাগ-ইন থাকলেও বিদ্যুৎ বিল বাড়বে না।
মূল্য ও ভারতীয় বাজারে অবস্থান
ভারতে এই মডেলটির সাধারণ বাজারমূল্য প্রায় ₹৭,৯৯৯। একই দামের মধ্যে অনেক ব্র্যান্ড HD Ready টিভি অফার করে, তবে Daiwa কিছু অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্য যেমন Eye-Care Mode ও বেজেল-লেস ডিজাইন যুক্ত করেছে, যা অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় বাড়তি সুবিধা।
যারা সীমিত বাজেটে স্মার্ট অভিজ্ঞতা চান, তাদের কাছে এই টিভি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয় হবে। বিশেষত প্রথমবার স্মার্ট টিভি কিনতে চাওয়া ব্যবহারকারীরা বেশি খরচ না করেও OTT কনটেন্ট ও ইউটিউব স্ট্রিমিং উপভোগ করতে পারবেন।
প্রতিযোগী বিকল্প ও তুলনামূলক বিশ্লেষণ
যদিও Daiwa একটি ভালো প্যাকেজ দিচ্ছে, এই সেগমেন্টে অন্য ব্র্যান্ড যেমন Xiaomi, Realme বা OnePlus তাদের বেসিক Android TV মডেল সরবরাহ করছে। Android TV-তে Play Store-এর মাধ্যমে আরও বেশি অ্যাপ সাপোর্ট পাওয়া যায়, যা টেক-স্যাভি ব্যবহারকারীদের কাছে বেশি আকর্ষণীয় হতে পারে।
তবে Daiwa-এর বিশেষত্ব হলো এর সাশ্রয়ী মূল্য এবং সরল UI। যারা জটিল অ্যাপ ও আপডেট নিয়ে ভাবতে চান না, তাদের জন্য Linux OS সহজ সমাধান হতে পারে।
সুবিধা ও অসুবিধার সারসংক্ষেপ
সুবিধা:
- বাজেট-ফ্রেন্ডলি প্রাইস
- বেজেল-লেস স্টাইলিশ ডিজাইন
- Eye-Care Mode যুক্ত, দীর্ঘক্ষণ দেখার পরও চোখ কম ক্লান্ত হয়
- জনপ্রিয় OTT অ্যাপ প্রি-ইনস্টলড
- যথেষ্ট পোর্ট ও ওয়্যারলেস স্ক্রিন মিররিং সুবিধা
অসুবিধা:
- কেবল HD Ready রেজল্যুশন, Full HD নয়
- RAM ও স্টোরেজ সীমিত, ভারী অ্যাপ বা গেমের জন্য উপযুক্ত নয়
- স্পিকারের বেস আউটপুট গড় মানের
- Android TV বা Google TV-র মতো বিস্তৃত অ্যাপ স্টোর নেই
শেষ কথা: দামে সেরা স্মার্ট এন্ট্রি
সব দিক বিচার করলে Daiwa D32H1COC একটি ভ্যালু-ফর-মানি স্মার্ট টিভি। বাজেট কম কিন্তু স্মার্ট ফিচারের স্বাদ পেতে চান—তাহলে এটি একটি নিরাপদ পছন্দ। ছোট পরিবারের দ্বিতীয় টিভি হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে, বা ছাত্রাবাস ও হোস্টেলের রুমে OTT ও কেবল টিভি দেখার জন্য আদর্শ।
যারা Full HD বা 4K-এর মতো হাই-এন্ড অভিজ্ঞতা চান, তাদের অবশ্যই বেশি দামের বিকল্প খুঁজতে হবে। কিন্তু দামের তুলনায় ₹৭,৯৯৯-এ এমন ফিচার-সমৃদ্ধ স্মার্ট টিভি খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। Daiwa প্রমাণ করেছে যে সীমিত বাজেটেও মানসম্পন্ন ভিজ্যুয়াল অভিজ্ঞতা সম্ভব।